বনছায়া
লেখক: মাশুদুল হক
জুলির সাথে কতদিন পর দেখা। বনের ধারে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ও সামনে পড়লো। খুব অবাক হলাম। ও যে এখানে আছে সেটা আমি জানতাম না।
এদিকে ঘাসেরা আকাশের দিকে মুখ বাড়িয়ে গাছের গোড়াগুলো ঢেকে ফেলেছে, ওর মাঝে কোথাও কোথাও হলদে সাদা অচেনা ফুল, স্বর্ণলতার ঝোপও আগ্রাসী হয়ে গাছ থেকে নেমে এসেছে। ভেজা পাতার এক ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধ, এ বনে কি চালতা গাছ আছে? চালতার পাতা থেকে এমন গন্ধ পাওয়া যায়।
জুলি, তুই বাড়িতে এসেছিস?
জুলিও অবাক হয়েছে। বলল, তুই নিজে তো অনেকদিন পর এলি। জানবি কি করে। আমি তো গত ছ’মাস ধরে এখানেই।
চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস!
হ্যা।
কেন?
শরীরটা খারাপ করলো খুব।
কী হয়েছে ?
ওসব শুনে কি করবি। তোর কি খবর?
বললাম, চলছে মোটামুটি। হাসপাতালের কাজ, অবসর কম। জীবনটা অসহ্য লাগে কখনো, মনে হয় নার্সিং এ আসাটা ঠিক হয়নি।
জুলি হাসে, কোন কাজে কষ্ট নেই বল?
তাও।
অনেকক্ষণ হেঁটে আমি হাঁপাচ্ছিলাম। রাস্তার পাশে একটা গাছের গুড়ি, গাছ কাটিয়েরা কেটে ফেলে রেখে গেছে, রেখে গেছে অনেকদিন বোঝা গেল। গুড়িতে শ্যাওলা জমে সবজেটে হয়ে গেছে, সাদা টুপি ছত্রাকের মাথা বেড়িয়েছে কোথাও কোথাও। ফেলে যদি রাখবে তাহলে ওরা কেন গাছটাকে আরো কিছুদিন বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো?
গুড়িটাতে সাবধানে বসে পড়লাম, প্যান্টে দাগ লেগে যায় কিনা সে আশংকা নিয়ে।
জুলিকে দেখে মনে হচ্ছে ওর বয়স আরো কমেছে। শুকিয়েও গেছে। চোখে মুখে একটা ছায়া। একটা সময় ওর চোখ মুখ সবসময় জ্বলজ্বল করতো।
সাবধানে বললাম, মাকে দেখতে এলাম। চলে যাব পরশু। মাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। যেতে চায় না।
নিয়ে যাবি কেন? তোর ওই শহরে উনি কি করবেন?
এখানেও তো কেউ নেই। বাবা যতদিন ছিল ততদিন এ চিন্তা করিনি।
তারপরও, এখানে কত চেনা মানুষ। তোর ওখানে ওনার সময় কাটবে কি করে?
সেটা জানি। কিন্তু কি করি বল। বাবাকে তো হাসপাতালেও নেয়া যায় নি। মা’র যদি এমন কিছু হয়।
জুলি তাতে কিছু বলে না। দাঁড়িয়ে ছিল, হয়তো হিসাব করছিলো আমার পাশে বসাটা ঠিক হবে কিনা। খানিক পর ইতস্তত ভঙ্গিতে বসে।
নভেম্বরের শীতল বাতাস বইছে। তাতে হেমন্তের ঘ্রাণ। রাস্তার পাশের নীচু হয়ে নেমে যাওয়া ঘাসেরা একপাশে হেলে পড়ছে। আকাশে মেঘ রোদ দুই আছে। রোদে তেজ নেই।
আমি জুলিকে জিজ্ঞেস করলাম, হাঁটতে বেড়িয়েছিস?
হ্যা, এই হাঁটার সময়টুকুই ভাল থাকি। বাড়িতে ভাল লাগে না।
তোর বাচ্চাটা কই? কেমন আছে?
ও আছে। মা’র কাছেই থাকে। সেই ছোটবেলা থেকেই তো মা’র কাছে। আমাকে আপন ভাবে না। রাতে ঘুমায়ও মা’র কাছে।
জুলির বিয়ে হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। ছেলেটা এই এলাকারই। বিয়েটা টেকেনি। ও ওর দু’বছর বয়েসী বাচ্চাকে ওর মা’র কাছে রেখে শহরে একটা চাকরি করতো।
তুই কি বসে থাকবি, না আরো এগুবি?
আমি হেসে উঠে দাঁড়াই।
এটুকু হেঁটেই হাঁপিয়ে গেছি, অবস্থা খুব খারাপ। তবে এখন ঠিক আছি। চল সামনে এগুই। তুই কোনদিকে যাবি।
জুলি হেসে বলল, শহর থেকে এসে প্রথম প্রথম আমিও বেশি হাঁটতে পারতাম না। এখন তো ছোটবেলার মত সারাদিন হেঁটে বেড়াই। চল, নেমে পড়ি।
বলে জুলি ইশারায় ওর পেছন পেছন আসতে বলে। মূল রাস্তা থেকে নেমে ও পাশের একটা বনের পথ ধরে।
পথটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, এ রাস্তা আমার অচেনা না। কত আসা যাওয়া করেছি ইশকুলে থাকতে। জুলির সাথেও এসেছি কত! পথটা ক্রমশ নীচে নেমে গেছে, খানিক পর আবার উপরে উঠবে।
কী পাখি ডাকলো বলতো?
আমি মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম। নাহ, বুঝতে পারছি না। শহরাঞ্চলে থেকে থেকে কানটা গেছে।
জুলি তাতে হাসলো। বললো, সেটাই স্বাভাবিক। মানুষ আস্তে আস্তে রুট ভুলে যায়।
একটু খোঁচার মত লাগলো। তর্ক করতে ইচ্ছা হল না। বললাম, তুই কি রোজ এ পথ দিয়ে বাড়ি ফিরিস?
ঠিক বাড়ি ফিরি না, বলতে পারিস এ পথ দিয়ে হাঁটাহাটি করি। পথটা কী সুন্দর। চারপাশে দেখ, কেমন প্রাণোচ্ছ্বল, লতাপাতা ছেয়ে আছে, গাছের পাতায় পাতায় রোদ পড়ে কী দারুন লাগছে। এখানে আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি।
হ্যা, তা সত্যি। তবে পথটা ভারী নির্জন।
সেটাই ভাল না?
কী জানি। আমি একটু হই হট্টগোল পছন্দ করি। বেশি নির্জন জায়গায় আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।
জুলি তাতে কিছু বলে না। নীরবে হেঁটে চলে।
হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটা যেখানে দুভাগ হয়েছে সেখানে পৌঁছাই।
এখান থেকে একটা পথ স্কুলের দিকে চলে গেছে। আমাদের এলাকার একমাত্র স্কুল আর কলেজ। ওখান থেকেই আমরা কলেজ শেষ করেছি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি, আমরা আলাদা হয়েছি, নিজেদের জায়গা ছেড়েছি।
জিজ্ঞেস করলাম, স্কুলটা একই রকম আছে?
জানি না, ওদিকে তো যাই না অনেকদিন!
যাবি? চল ঘুরে আসি।
জুলি যেন ফুসে উঠলো, তুই যা। আমার কাজ আছে।
বেশিক্ষণ তো লাগবে না।
তরু, তুই কি সব ভুলে গেছিস। ওই পথ দিয়ে আমি যেতে পারবো না।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। আমি আসলেই ভুলে গেছিলাম। অস্বস্তি আর পুরনো অপরাধবোধে যেন আমি মাটির সাথে মিশে গেলাম।
জুলি, মাফ করে দে, আমার মনে ছিল না।
জুলি আমার কথায় চুপ হয়ে গেল। তারপর থেমে বলল,
না, ঠিক আছে। তোর তো কোন দোষ ছিল না।
খানিকটা পথ যাওয়ার পর ও বিদায় নিল। ওর বাড়ি এখান থেকে কাছেই। যাওয়ার আগে বলল,
তরু, তুই জানিস। ওই পথ দিয়ে গেলে এখনো তমালগাছটা পড়ে। ওখানে আমি এখনো সন্তুর ছায়া দেখতে পাই।
আমার চোখে সাথে সাথে জল চলে আসে।
আমাকে তোরা মাফ করে দিস জুলি। এমনটা হবে জানলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে হলেও সন্তুদার কাছে চলে যেতাম।
জুলি আমার পিঠে হাত রাখে।
আমি জানি তরু। আমি জানি।
বনে শো শো শব্দে পাতা ঝড়া শীতল হাওয়া বওয়া শুরু করলো। সে হাওয়ায় আমাদের চাপা কান্নার শব্দ মিলিয়ে গেল।
২
সন্তুদা আমাকে ভালবাসতো, জুলির বড় ভাই। আমাদের চেয়ে এক বছরের বড়। যতদিন কলেজে পড়েছি কখনো মুখ ফুটে সেটা বলেনি। আমার সবসময়ই মনে হত সন্তুদা আমাকে পছন্দ করে, কিন্তু বলতে সাহস করেনি।
এমন সময় বলল, যখন আমার কিছু করার ছিল না। বিয়ের কথা পাকা হওয়ার পর একদিন জানতে পারলাম।
জুলিও জানতো না। খুব অবাক হয়েছিল জেনে। বলেছিল, ও যে কেন আমাকেও কোনদিন বলেনি! কত সহজ ছিল, তুই আমার কত কাছের বন্ধু। আমাকে জানালেও তো আমি তোর সাথে কথা বলতে পারতাম।
হয়তো এজন্যই বলেনি। তোর আর আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে ভেবে।
হয়তো! ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতো।
সন্তুদা কলেজে যাওয়ার পথের তমাল গাছে ফাঁসি নিয়ে মারা যায়। আমার বিয়ের এক সপ্তাহ পর।
আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর ওই গাছের সামনেই একদিন বলেছিল, তরু তোকে ভালবাসি। তোর কারো সাথে বিয়ে হলে মরে যাব।
শুনে আমার কান লাল হয়ে গেছিলো।
সন্তুদা, কী বলছো! এখন কীভাবে সম্ভব। তুমি জানো না বাবা কেমন কড়া?
ওই ছিল শেষ আলাপ ওর সাথে।
বাড়ির পথ ধরি।
কী মনে করে আবার পেছন ফিরে স্কুলের পথটায় যাই।
কতদিন পর! রাস্তাটা ঠিক আগের মত আছে।
বাতাসের শো শো বাড়তে থাকে।
মনে হচ্ছে ঝড় আসবে। আকাশও কালো হয়েছে।
আমি থামি না। বাতাসের থেকে হাত দিয়ে মুখ আড়াল করে এগুতে থাকি।
মনে হল যেকোন সময় বৃষ্টি নামবে।
সন্তুদা, কত সহজেই তোমাকে ভালবাসা যেত! কেন আগে বললে না!
বাতাসের জোর বাড়তে থাকে। আশপাশের গাছেরা যেন প্রাণপনে মাথা উঁচিয়ে রাখতে চাইছে আর হার মানছে। শো শো আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে ডালপালার আছড়ে পড়ার শব্দও বেড়ে চলছে। পেছনে না গিয়ে আরেকটু এগুলে স্কুলে গিয়ে হয়তো একটা ঠাঁই পাবো। তাই দ্রুত পা চালাই।
প্রথমে অল্প অল্প ফোঁটায় বৃষ্টি টের পাচ্ছিলাম, বড় বড় ফোঁটায় সেটা পরিণত হতে শুরু করলো। আমি প্রায় দৌঁড়ে সামনে এগুনো শুরু করলাম।
বেশি দূর যেতে পারলাম না,হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম রাস্তায়। পুরোপুরি ঝড় শুরু হয়ে গেছে। কড়কড় করে বিদ্যুৎ চমকালো। বজ্রপাতের আলোয় দেখলাম হোঁচট খেয়েছি ওই তমাল গাছটার শিকড়েই। বিশাল মহীরুহের মত গাছটা যেন এক অশরীরী দেহ নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছে। বাতাসের তোড়ে ওর সব ডালপালা ভয়ংকর ভাবে নড়েচড়ে উঠছে, যেন এক জ্যান্ত দানব ওর সব শুঁড় আকাশে তুলে প্রস্তুতি নিচ্ছে আমাকে পিষে ফেলতে।
আমি মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বসে পড়লাম। ঝড়ের তোড়ে কিংবা উপড়ে যাওয়া গাছপালার ডালে আজ ভীষণ কিছু একটা হবে সেটা ধরে নিয়েছি।
আবার কড়কড় করে বিদ্যুৎ চমকালো।
আমি তড়িৎ একবার উপরে তাকালাম। বজ্রপাতের আলোয় আরেকটি দৃশ্য আমাকে বাকরুদ্ধ করে ফেললো।
বিশাল তমাল গাছের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিবার বজ্রপাতে। দেখলাম তমালের ডালে একটা মানব ছায়া বসে আছে। সাথে সাথে উপরে তাকাই, না কোন মানুষ নেই। এই ঝড়ে থাকা সম্ভবও না।
ছায়াটা কার বুঝতে বাকি রইলো না।
সন্তুদা!
জুলি মিথ্যে বলেনি।
সন্তুদা গাছ থেকে নীচে নেমে এসেছে। আমি ওকে দেখছি না, কিন্তু ওর ছায়া আমার ছায়ার পাশেই বসেছে।
আমার ছায়া হঠাৎ ওর দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল। আমি জমে ছিলাম এক অচেনা হিম বিস্ময় আর আতংকে, ঝড়ের মধ্যে যে আতংক আলাদা করে প্রকাশযোগ্য ছিল না।
আমার ছায়া সন্তুদার দিকে যেন এগিয়ে গেল ।
সন্তুদার ছায়া আমার ছায়ার হাত ধরলো আমি স্পষ্ট বুঝলাম। দুই ছায়া তারপর কই যেন মিলিয়ে গেল। আমি স্পষ্ট দু’জন মানুষের হাসির আওয়াজ পেলাম, একটা কণ্ঠ আমার আর অন্যটা সন্তুদার। কতদিন পর শুনলাম ওর গলা!
∆∆∆
একসপ্তাহ পর আমি আমার পাহাড়ি গ্রাম থেকে চলে আসি। এবার মা আমার সাথে এসেছে। ওই গ্রামে যাওয়ার হয়তো আর প্রয়োজন হবে না কোনদিনই।
আমি কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করি হাসপাতালে, রোগীর চাপ যেন রোজ বাড়ে।
ওইদিনের সেই অদ্ভুত ঘটনাটা ভুলে যাই। মনে হয়, নিশ্চয়ই ওটা স্বপ্নদৃশ্য ছিল।
কিন্তু সেটাও মানতে পারি না।
একা একা যখন রাস্তায় হাঁটি, মাঝে মধ্যেই খেয়াল করি, আমার কোন ছায়া পড়ছে না।
না পড়ুক, আমার ছায়া থাকুক সন্তুদার কাছে!
