খুকি
লেখক: মাশুদুল হক
২০১৩, সিলেট
শাহজালাল হোস্টেল সন্ধ্যা হতেই এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে যায়। সারাদিন ডিউটি করে একদল এসেই ঘুম দেয়, অন্যদল নাইট ডিউটির জন্য বের হয়ে যায়। হোস্টেলের একদম শেষ মাথায় দোতলায় একটা তিন বেডের রুমে আমি আশ্রয় নিয়েছি । আমার হাসপাতালে ডিউটি শুরু হয়নি, ফাইনাল প্রফে মেডিসিন ক্লিয়ার হলো না, সব মিলিয়ে আমাদের সতের জনের। পঁচা শামুকে পা'কাটার মত অসপিতে ফেল করিয়ে দিল। কী কষ্ট। এত বড় বড় পার্টগুলোতে পাশ করে ওই তুচ্ছ অসপিতে আটকে দিল? ছয়মাস পর আবার পরীক্ষায় বসতে হবে, তাও যদি যেটায় ফেল করেছি সেটায় বসলেও না হয় কথা ছিল। দিতে হবে পুরো মেডিসিন পরীক্ষা।
কাজটা করেছে বাকী স্যার, লোকটাকে কত শ্রদ্ধা করতাম, মনে মনে ভাবতাম কোনদিন যদি মেডিসিনে ক্যারিয়ার করি তার অধীনে কিছুদিন ট্রেনিং করবো। কিন্তু উনি এমন কাজ করায় মনটাই ভেঙে গেল। ছয়মাস আবার সেই একই পড়া আমাদের এক তুচ্ছ কারণে পড়তে বাধ্য করলেন, সময়মতো ইন্টার্নিতে জয়েন করতে দিলেন না, এসব ভেবে দারুণ অভিমান হয়।
রেজাল্ট দিতে লাগালো দুইমাস, আর ফেল করার শোকে কাটলো আরো একমাস। এখন কোমড়ে দড়ি বেঁধে নামা ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। আর ঠিক তিনমাস পরে পরীক্ষা।
লাইব্রেরিতে যাওয়া শুরু করলাম, রুমে বসে পড়া হয় না। রুমমেটরা পড়াশোনা করছে না এমন অবস্থায় রুমে বসে পড়া দারুণ মুস্কিল। লাইব্রেরিতে সে ঝক্কি নেই, একটাই ঝামেলা রাত দশটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। আমি আজীবন রাত জেগে পড়া মানুষ, মানিয়ে নিতে ক'টা দিন লাগলো।
ইলোরা মাঝে মধ্যে দেখে যায় ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে। ও খুব সিরিয়াস স্টুডেন্ট, ওর চাপে আমিও পরীক্ষার আগে খুব নিয়মিত পড়াশোনা করতাম। ওর ইন্টার্নি সার্জারি দিয়ে শুরু হয়েছে। ও আসলে জিজ্ঞেস করি, কেমন যাচ্ছে নতুন ডিউটি। ওর কিছুটা অস্বস্তি হয়, খুব বেশি কিছু বলে না, শুধু বলে-খুব ঝামেলা। রোগী আসতেই থাকে বানের জলের মত। ইলোরা হয়তো ভাবে ডিউটির কথা বললে আমি কষ্ট পাবো, যদিও এমন কিছু সত্যি না, পরীক্ষার ব্যর্থতাকে হাসি মুখে মেনে নেয়ার অভ্যাস অধিকাংশ ছেলেরই থাকে-মেয়েদের জন্য ফেল করা ভারী লজ্জার। সবার জন্য সত্য না হয়তো, তবে অধিকাংশের বেলায় তাই হয়তো।
ইলোরা এমনিতে খুব ভাল স্টুডেন্ট, তবে প্রফেশনাল পরীক্ষায় সব গুলোতে পাস করে যাওয়ার জন্য শারীরিক মানসিক দুই শক্তিই লাগে-তাই খুব দু:শ্চিন্তা করছিলো। সত্যি বলতে আমি ওর রেজাল্ট নিয়ে বেশ শংকিত ছিলাম, আমার রেজাল্টের চেয়েও বেশি । একটা পরীক্ষায় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে, ভাগ্য ভালো তাতে কোন সমস্যা হয় নি।
নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করলাম। আবার হোচট খাওয়া যাবে না। পরীক্ষার যখন মাসখানেক বাকি তখন হঠাৎ দেখি আসিফ এসে হাজির লাইব্রেরিতে । আসিফকে চেনা যাচ্ছে না। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে । আসিফ পরীক্ষার কিছুদিন আগে মানসিক ভাবে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই পরীক্ষায় বসে নি। আসিফ হল গিয়ে যাকে বলে ক্লাস টপার। ও যখন পরীক্ষায় বসতে পারলো না তাতে আমরা সবাই ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। সারাক্ষণ পড়াশােনায় বুঁদ হয়ে থাকতো বলে ক্যাম্পাসে ওর ভাল বন্ধু খুব সীমিত। হঠাৎ দেখলাম ওর বাপ-মা ক্যাম্পাসে এসেছে। যে গাড়িতে ওনারা এসেছেন সেটাতে করেই ছেলেকে নিয়ে গেলেন, কারো সাথে তেমন কোন কথা বললেন না। পরে শুনলাম আসিফ পরীক্ষায় বসবে না।
ইলোরা আর আসিফ একই সেকশনে ছিল। ইলোরারাও কিছু জানতো না। শুধু বলল, শেষ কিছুদিন আসিফ ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
আসিফ যখন আসে সৌভাগ্যক্রমে ইলোরা সেদিন আমার সাথে ছিল। ও একটা টেবিল দখল করে বসেছে দেখে ইলোরা বলল, চলো ওর খোঁজখবর নিয়ে আসি।
আমি একটু আপত্তি করছিলাম কিন্তু ইলোরা বারণ শুনলো না।
আমাদের দেখে আসিফ একটু চমকালো ।
অবাক হয়ে বলল, তোমরা এখানে কী করো?
আমি বললাম, মেডিসিনে ধরা খাইছি। তোর কী খবর?
আর ইলোরা? আসিফের প্রশ্ন শেষ হয়না।
ইলোরা এসেছে আমাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে।
আসিফ মুচকি হেসে বোঝালো ব্যাপারটা ও বুঝেছে। তাই বলো, ইলোরা তো ধরা খাওয়ার মত মেয়ে না। সার্জারিতে প্রতিবার ওর সাথে ফাইট দিতে হত।
ইলোরা বলল, তোমার এখন কী অবস্থা। পরীক্ষায় তো বসছো?
এখন পর্যন্ত তাই তো ঠিকঠাক।
ইলোরা তারপর যেটা বলল, তাতে আমার একটু অস্বস্তি হল। ও বলল, তোমরা দু’জন একসাথে পড়ো। অন্তত একটা সাবজেক্ট ডিসকাস করে পড়তে পারো।
আসিফ তাতে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, অবশ্যই। আমারও উপকার হয়।
আমি বললাম, তোর উপকার হওয়ার চান্স খুবই কম। ভুলে যাইস না, আমি টেনে টুনে পাশ করাদের দলের।
আরে কী যে বলিস। তারপর ইলোরার দিকে ফিরে বলল, তুমি টেনশন করো না, মাশুদকে মেডিসিন ভাজা ভাজা করে দেবার দায়িত্ব আমার। হাহা।
আসিফের একটা ভাল গুণ খেয়াল করলাম এ ঘটনার পর। সেটা হল, ও একদমই খোলা মনের মানুষ। অথচ এতদিন ভেবে এসেছি দারুণ অহংকারী ছেলে হিসেবে। মানুষের অন্তর্মুখীতা অনেক সময়ই ভুল ভাবে প্রকাশ পায়।
সপ্তাহে দুইদিন আমরা একসাথে পড়তাম। সেসময়ে আসিফ মূলত আমাকে পড়াতো বললে অত্যুক্তি হবে না। এবং আমার মনে হয়েছে, ওই দুইমাসে আমি মেডিসিনের যত কিছু শিখেছিলাম তা গত দুই বছরেও আমার জানা ছিলনা।
পরীক্ষার ঠিক এগার-বার দিন আগে হঠাৎ পরপর দুইদিন আসিফ পড়তে এল না লাইব্রেরিতে। ফোনেও পেলাম না। ফোন বন্ধ।
তিন নম্বর দিনেও যখন আসলো না তখন একটু চিন্তিত হলাম। ইলোরাকে জানালাম। ও বলল, ও জানার চেষ্টা করবে।
সন্ধার দিকে ইলোরা লাইব্রেরিতে এসে বলল, আসিফ সুবিদ বাজারের একটা প্রাইভেট হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে গত দুইদিন ধরে পড়ে আছে। আমাদের নাফিস ওখানে কিছু ডিউটি করে, ওই আমাকে জানালো। ও আসিফকে জিজ্ঞেস করেছিলো, কোন রোগীর জন্য ও বসে আছে। ও ঠিকমতো জবাব দেয়নি।
বলো কি? ওর আগের সমস্যা আবার ফিরে আসলো না তো?
কী জানি, অথবা হতে পারে ওর পরিচিত কেউ আসলেই অসুস্থ। যাবা নাকি?
হ্যাঁ, অবশ্যই।
আসিফের সাথে এ ক’দিনে আমার যে অন্তরঙ্গতা হয়েছে তাতে বিশ্বাস হয়, নাফিসকে না বললেও মূল ঘটনা ও আমাকে বলতে রাজি হবে। তাই আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।
বাইরে প্রবল শীত পড়েছে। তাতে জবুথবু হয়ে একটা রিকশা নিয়ে লারোজা হাসপাতালের দিকে আমরা রওনা হলাম এক অভূতপূর্ব ঘটনার স্বাক্ষী হতে।
₼₼₼
আসিফ আমাদের দিকে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, তোমরা কি জানো আমি গতবার কী সমস্যায় পড়ে পরীক্ষাতে বসতে পারিনি?
আমরা বসে আছি লারোজা হাসপাতালের থার্ড ফ্লোরে। আইসিইউর সামনে। এখানে রোগীর আত্মীয় স্বজনের জন্য একটা ওয়েটিং স্পেস আছে। সেখানে বসার সুব্যবস্থা আছে।
আমি বললাম, শুনেছি তোর একটা সাইকোলজিক্যাল ইস্যু হয়েছিল। প্রফের আগে বেশি চাপ নিয়ে ফেলেছিলি মেবি।
আরে ধুর! পড়াশোনা নিয়ে আমি কখনো বেশি চাপ নেই না। আমার স্টাইল হল, একই গতিতে সবসময় পড়া। সে পরীক্ষার একদিন আগে হোক কি ছয়মাস আগে। আচ্ছা, তোদের খুলে বলি। আমার সিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়ে।
কী বলো? আমি আর ইলোরা দুজনাই চমকাই।
হ্যাঁ, তোমরা হয়তো খেয়াল করো নি। আমি ইমাজিনারি অনেক কিছু শুনতাম, দেখতাম-টিপিক্যাল হ্যালুসিনেশন। আমি নিজে থেকে বাবাকে জানাই আমার চিকিৎসা প্রয়োজন, তারা যেন আমাকে নিয়ে যায়। আমি যদি সেসময় জোর করে পরীক্ষায় বসতাম তাহলে ব্যাপারটা ভীষণ খারাপ দিকে যেতে পারতো।
হ্যাঁ অবশ্যই! ইলোরা সায় দেয়।
যাইহোক, তোমরা কেউ জানতে না, কিন্তু আমি সিলেটেই ছিলাম। মনোরমা ক্লিনিকে।
মানে ওবায়েদ স্যারের ক্লিনিক?
হ্যাঁ।
সিলেট মেডিকেল কলেজে সাইকায়াট্রি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ওবায়েদ স্যার। আমরা তার ক্লাস করেছি। সিলেটেই তার একটা ক্লিনিক আছে আমরা সেটা জানতাম।
তোমরা মনোরমা তে কখনো গিয়েছিলে?
আমি ইলোরা দুজনই মাথা নেড়ে জানালাম আমাদের যাওয়া হয়নি।
আচ্ছা, হাসপাতালটা মূলত একটা বাড়ি, ছিমছাম দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে বাগানের মত, ছোট খাট কিছু গুল্ম আর নানা জাতের ফুলের গাছ-মানে ওভারঅল ভাল পরিবেশ। বাড়ির মালিক স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে থাকেন। ওবায়েদ স্যার মূলত এখন দেখভাল করেন। বাড়ির মালিক তার ছেলেবেলার বন্ধু। একসাথে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। যখন জানতে পারেন ওবায়েদ স্যার একটা জায়গা খুঁজছেন হাসপাতালের জন্য, তখন নিজ থেকেই প্রস্তাব করেন মীরাবাজারে প্রায় পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে থাকা বাড়িটা কাজে লাগাতে। ওখানে আমি টানা তিনমাস থাকি। এবং তাদের যত্ন আত্তিতে সুস্থ হই।
আমি সিলেট মেডিকেলের ছাত্র আর ওবায়েদ স্যার আমাকে খুব ভাল মত চেনেন বলে একটা পর্যায়ে আমি আর রোগীর মত ছিলাম না। আমি হাসপাতালের নানা কাজ করে দিতাম। সেটা পেশেন্ট ম্যানেজ করা থেকে শুরু করে ক্যানুলা করা, ইনজেকশ পুশ করা, রোগীর অন্য সমস্যা হলে তাকে ডিসপেনসারি থেকে জরুরী ঔষধ দেয়া ইত্যাদি। রাউন্ডে ওবায়েদ স্যার আমাকে রাখতেন, রোগীদের জেনারেল এক্সামিনেশন করাতেন কখনো, মানে ওয়ার্ডে পোস্টিং হলে যা যা করা লাগে তাইই। এসব কারনে আমি স্যারের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ, এসব না করতে পারলে জায়গাটা অসহ্য হয়ে যেত আমার কাছে। আমার ধারণা ওবায়েদ স্যার এটা চিকিৎসার অংশ হিসেবেই করেছেন।
আমার রিলিজ হওয়ার কিছুদিন আগে মনোরমাতে একজন নতুন রোগী আসে। মধ্যবয়স্ক এক রোগী।
এই রোগীর সমস্যাটা একটু অদ্ভুত। রোগী সমস্যাটা সারাতে চাচ্ছিলো না কোনভাবেই। কিন্তু তার ফ্যামিলি এটা নিয়ে বেশ সাফার করেছে, তাই কিছুটা জোর করেই তারা তাকে হাসপাতালে অ্যাডমিট করায়।
কি সমস্যা ছিল?
সেও সিজোফ্রেনিক ছিল। ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশন হতো। অনেক ইমাজিনারি ব্যাপার-স্যাপার হয়তো দেখতো, তবে সবচেয়ে প্রমিনেন্ট ছিল একটা ছোট মেয়েকে দেখতো, তার মৃত মেয়ে, ছয় বছর বয়সে মারা গেছিলো । মেয়েটা বলতে গেলে তারসাথে সবসময়ই থাকতো যখন সমস্যা হতো।
এবং সে চাইতো এই দেখাটা তার অব্যাহত থাকুক?
ঠিক। নিয়মিত ঔষধ পত্র খেলে মেয়েটাকে আর দেখা যেত না। যেটা সে মানতে পারতো না।
ইন্টারেস্টিং কেস! আমি সায় জানালাম। লোকটার জায়গায় আমি থাকলে আমিও হয়তো তাই করতাম।
তো, হাসপাতালে বসেই লোকটার সাথে আমার অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়। তার গল্পটা শুনে আমি নিজে থেকেই তার সাথে যেচে আলাপ করতাম নিয়মিত। সেকারণেই হয়তো। আচ্ছা, তো ব্যাপার হচ্ছে গত পরশু দিন উনি স্ট্রোক করেন। অবস্থা একটু ক্রিটিক্যাল। হাসপাতালে থাকার সময় ওনার ফ্যামিলির সাথে আমার পরিচয় হয়, তারা রোগীর ব্যাপারে কিছু জানতে হলে আমাকেই ফোন করতেন। ওনাদের বাসায়ও আমি কয়েকবার গিয়েছি মনোরমা থেকে ওনার রিলিজের পর।
ওনার রিলিজ হয়েছিল?
হ্যাঁ, অনেক কাউন্সিলিং এর পর উনি রেগুলার ঔষধ খাওয়া শুরু করেন। একসময় ওনার সমস্যাটা কেটে যায়। খুকি বিদায় নেয়।
খুকি?
মেয়েটার নাম।
আচ্ছা।
তো, ওনার স্ট্রোকের কথা শুনে আমি আর অন্য কিছু করতে পারছিলাম না। তাই চলে এসেছি।
আসিফের মুখে ঘটনাটা শুনে বেশ মন খারাপ হল। কত ধরণের সমস্যা নিয়ে মানুষ জীবন পার করে। আবার সেই সমস্যা থেকে মন যখন স্বস্তি পেতে নিজে কোন ব্যবস্থা নেয়, সেটাকেও আমরা রোগ-ব্যাধির ট্যাগ দিয়ে মেনে নিতে অসম্মতি জানাই।
আসিফকে নিয়ে আমরা রোগীকে দেখে আসি। জেনারেল ওয়ার্ডে একটা বেডে নিশ্চল পড়ে আছে বছর চল্লিশের এক মধ্যবয়স্ক লোক। মাঝারি উচ্চতার, গালে অল্প করে দাড়ি গোঁফ, মাথায় চুল কমের দিকে। পড়নে হালকা পোশাক। লোকটার স্ত্রী পাশে বসে ছিলেন।
আমাদের আসতে দেখে তার চোখের অসহায়ত্ব ভেদ করে একটা উৎসুক দৃষ্টি নজরে পড়লো।
আসিফকে বলল, ভাইয়া, আপনি এখনো আছেন? কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ দিব।
আসিফ সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, নতুন সিটি স্ক্যান দিয়েছে?
এখনো না।
আসিফ শুনে চিন্তিত মুখে বলল, আর একটা সিটি স্ক্যান করা জরুরী মনে হচ্ছে। দেখি আমি বলে দেখবো।
আমি আর ইলোরা সেদিনের মত চলে আসলাম।
আসিফ আর সে সপ্তাহে লাইব্রেরিতে আসলো না। পরীক্ষার চাপে আমিও আর যোগাযোগ করলাম না। পরীক্ষার দিন তিনেক আগে ইলোরার মুখে শুনলাম আসিফ নাকি এখনো রোজ লারোজা হাসপাতালে যাতায়াত করছে।
ও কি পরীক্ষায় এবার বসবে?
কী জানি। হয়তো পড়ার আর কিছু নেই। তাই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
₼₼₼
আমি খুব আশা করে ছিলাম, আসিফ শেষমেশ পরীক্ষায় বসবে। কিন্তু ও বসেনি। ও আবারও লাপাত্তা হয়ে গেল। শুনলাম ওর রোগীকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছিল। আসিফও নাকি তাদের সাথে করে যায়। অনাত্মীয় এক রোগীর প্রতি আসিফের এ মমত্ত্ব বাড়াবাড়ি মনে হল। ধরে নিলাম এখনো ও মানসিক ভাবে পুরোপুরি সুস্থ না।
অগাস্ট মাসের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। রেজাল্ট খুব দ্রুত দিয়ে দিল।
পাশ করে গেলাম। এক সপ্তাহের মধ্যেই ইন্টার্নির ডিউটিতে জয়েন করলাম।
ইলোরার ততদিনে সার্জারি শেষ হয়ে গাইনী শুরু হয়েছে। আমিও তাই গাইনীতে জয়েন করলাম। গাইনীতে প্রচুর ব্যস্ততা। অনেক অনেক রোগী। এখানে তিনটা ইউনিট। প্রতি ইউনিট সপ্তাহে দুইদিন করে নতুন রোগী রিসিভ করে। যেকোন একটা ইউনিট সপ্তাহে তিনদিন রোগী রিসিভ করে।েস সপ্তাহে ওই ইউনিটের জীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। এই অতিষ্ঠ সপ্তাহকে বলে মেগা-উইক। একটা শহরে কত বাচ্চা প্রতিদিন জন্মাতে পারে তার কোন ধারণা আমার আগে ছিল না গাইনীতে িডউটি করার আগে। শত শত মানুষ পেটে বাচ্চা নিয়ে যেন আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, প্রত্যেকেরই বাচ্চা এখনই জরায়ু থেকে বের হয়ে যাবে, প্রত্যেকেরই পানি ভেঙেছে, কেউই ব্যথ্যা সহ্য করতে পারছে না। আর রুমের বাইরে অন্তত আরো দশজন আহাজারি করছে। এই হল অবস্থা। পুরো পাগল পাগল দশা।
একদলকে নরমাল ডেলিভারির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আরেকদল ঢুকছে ওটিতে, সিজারিয়ান সেকশন হবে। বেডের অতিরিক্ত রোগীতে পুরো ওয়ার্ড সয়লাব। কারন রোগী ফেরত দেয়ার সুযোগ সরকারী হাসপাতালে নেই, এমনকি এসব রোগীকে ফেরত দেয়ার সুযােগও নেই। মেঝেতে বেড পেতে শুতে যদি তাদের আপত্তি না থাকে তাহলে তাকে রাখতেই হবে।
এমন এক মেগা উইকে শুনতে পেলাম আসিফ ফেরত এসেছে। তাকে লাইব্রেরি থেকে বের হতে দেখেছ আমাদের এক ক্লাসমেট। ইলোরাকে ব্যাপারটা বলার পর ওর প্রতিক্রিয়া হল দারুন। পার-ভ্যাজাইনাল এক্সামিন করা হাত থেকে গ্লাভস একটানে খুলে আমাকে বলল, চলো এক্ষুনি ধরতে হবে পাজিটাকে। আবার না হাওয়া হয়ে যায়।
আমি মুচকি হেসে ব্যাগ নিয়ে নিলাম। এক ক্লাসমেটকে বললাম, কিছুক্ষনের জন্য ব্যাকাপ দিতে। ইলোরাকে আমার সাথে দেখে আর কথা বাড়ালো না।
আমরা উর্ধ্বশ্বাসে বের হয়ে গেলাম।
₼₼₼
আসিফ আমাদের দু'জনকে একসাথে ওর সামনে আসতে দেখে একটু ভড়কালো।
এই, কী অবস্থা তোমাদের?
ইলোরা বলল, আসিফ কি হয়েছিল তোমার?
এক স্পষ্ট অস্বস্তি প্রকাশ পেল আসিফের চোখে মুখে। আমরা ততক্ষণে ওর টেবিলের সামনে চেয়ার পেতে বসেছি।
ও অসহায় ভঙ্গি করে বলল, আমার কথা বাদ দাও। তোমাদের ডিউটি কেমন চলছে?
ডিউটি চলছে ভাল। আমি সংক্ষেপে বলি। তুই কই ছিলি? পরীক্ষাও দিলি না।
আসিফ আমাদের দু'জনের দিকে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে বলল, তোমরা বিশ্বাস করবে না।
ইলোরা বলল, না করলে নাই। কিন্তু আমাদের শুনতে হবে। তোমার মত স্টুডেন্ট পরপর দু'বার প্রফেশনাল পরীক্ষায় বসো নি। এটাই যথেষ্ট অবিশ্বাস্য!
আসিফ হাল ছেড়ে বলল, আচ্ছা, তবে তোমরা কাউকে শেয়ার করবে না সেটার নিশ্চয়তা পেতে পারি?
ইলোরা এককথায় বলল, অবশ্যই পারো।
কিছু একটার কসম কেটে বল!
মানে?
আসিফ হেসে বলল, এভাবে নিশ্চয়তা নিশ্চিত হয়? বলতে হয়, গডের কসম বা অন্য কারো।
আচ্ছা, সিলেট মেডিকেলের পরীক্ষায় অনাগ্রহী অতি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র আসিফের কসম! ইলোরা হেসে বলল।
আসিফও মুচকি হেসে বলল, আচ্ছা কসম কাটতে হবে না। তোমাদের আমি বিশ্বাস করি।
আচ্ছা, ঘটনা হল, জয়নাল সাহেবের, মানে খুকির বাবার অবস্থা যে খারাপ এটা আমি টের পাই। আমার প্রেডিকশন ছিল উনি বড়জোর তিন কি চারদিন বাঁচবেন। ওনার সিটিস্ক্যানের রিপোর্ট বেশ খারাপ ছিল। কিন্তু জয়নাল সাহেব আস্তে আস্তে রিকভার করা শুরু করেন। একটু স্টাবল হতে লারোজা থেকে ঢাকার পিজি হাসপাতালে রেফার করে দেয়। আমিও তখন ওনাদের সাথে যাই।
ইলোরা আসিফকে থামায়, কেন? রোগীর সাথে তো অন্য লোক ছিল, তোমার যাওয়ার দরকার কি ছিল?
আসিফ একটু থেমে আস্তে আস্তে বলল, জয়নাল সাহেবের মৃত্যুর সময়টাতে আমি তার পাশে থাকতে চাচ্ছিলাম।
ওর জবাবে আমরা আর কিছু জিজ্ঞেস না করে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে রইলাম, ওর উত্তরটা যে সম্পূর্ণ হয়নি সেটার একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল আমাদের আচরণে।
আসিফ বলল, এ ধরনের ইচ্ছা হতে পারে না? লোকটার সাথে আমার অন্তরঙ্গতা ছিল তোমাদের আগে বলেছি।
ইলোরা স্পষ্ট গলায় বলল, খুব অল্প সময়ের অন্তরঙ্গতা, সেটার কারনে প্রফের মত পরীক্ষা বাদ দিয়ে তুমি চলে গেলে, বিশ্বাস হল না। তোমরা কি স্পেশাল কোন সম্পর্কে ছিলে?
আসিফ তাতে বিষম খেয়ে বলল, আরে না! কী যে ভাবছো তুমি। আচ্ছা বলছি শোনো।
জয়নাল সাহেব যখন খুকিকে দেখতো, আমিও মাঝে মধ্যে ওকে দেখতে পেতাম।
মানে? আমরা দু'জনাই চমকে উঠলাম।
হ্যাঁ, দুইজন সিজোফ্রেনিক মানুষ কখনো একই হ্যালুসিনেশন দেখতে বা শুনতে পারে। শেয়ারড হ্যালুসিনেশন বলে এটাকে। folie à deux. খুবই রেয়ার, এবং মূলত একজন দ্বারা আরেকজন প্রভাবিত হয়েই দেখে, কিন্তু এটা একটা বড় মেডিকেল মিস্ট্রি সেটা স্বীকার করতেই হবে।
আমি আসলে এ ক'টা দিন খুকিকে সঙ্গ দিয়েছি। জয়নাল সাহেব ঔষধ খাওয়া বন্ধ করাতে খুকি সবসময় ওনার সাথে থাকতো। কিন্তু মেয়েটা ভীষণ ভয় পাচ্ছিলো। আমি ওকে একা রেখে আসতে পারছিলাম না। জয়নাল সাহেব অচেতন থাকায় আর কেউ ওকে সঙ্গ দেয়ার মত ছিল না।
এটা শুনে আমরা একটু স্তব্দ হয়ে যাই। কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না।
আসিফ বলে চলল, সাধারণত শেয়ারড হ্যালুসিনেশন পেশেন্টদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে যার যার সাথে হ্যালুসিনেশন শেয়ার হচ্ছিলো তারাও আর দেখতে বা শুনতে পায় না। সে হিসেবে জয়নাল সাহেবের মৃত্যুর সাথে সাথে খুকিও হারিয়ে যাবে। বলতে পারো, জয়নাল সাহেবের চেয়ে খুকির মৃত্যুটা আমার জন্য বেশি হৃদয়বিদারক ছিল।
ওকে দেখার জন্য আমি আগে প্রায়ই জয়নাল সাহেবের বাড়িতে যেতাম। আমরা তিনজন, আমি জয়নাল সাহেব আর খুকি, দীর্ঘ সময় ধরে গল্প করতাম। জয়নাল সাহেব বলতো, খুকি আমার জন্য অপেক্ষা করে। আমিও সেটা বুঝতে পারতাম, আমি গেলে ও ভীষণ উচ্ছ্বল থাকতো।
আসিফ একমনে বলে যাচ্ছা, ইলোরা আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকাল। আমি ইশারায় ওকে ধৈর্য ধরতে বললাম।
জয়নাল সাহেব বলতো যদি তার কিছু হয়ে যায় তাহলে আমি যেন খুকিকে আমার সাথে নিয়ে যাই। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম, সেটা সম্ভব না। খুকির অস্তিত্ব মূলত তার অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। আমি চাইলেও খুকিকে আমার কাছে রাখতে পারবো না। সেটার প্রমাণ আমি পেতাম, জয়নাল সাহেব থেকে অল্প কিছু দূরে চলে গেলেই খুকি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেত।
তিন দিন আগে পিজি হাসপাতালে মারা যান জয়নাল সাহেব। তারপর আমি চলে আসি।
খুকি? ইলোরা প্রশ্ন করে।
খুকিও মিলিয়ে যায়। আসিফ আমাদের দিকে না তাকিয়ে বলল।
এরপর দীর্ঘ নীরবতা।
আমি ইলোরাকে ইশারা করি, আমাদের উঠতে হবে। বেশি দেরি হলে সিএ আপা রাগ করবেন। নালিশও করে দিতে পারেন আমাদের নামে যে অ্যাডমিশন ডিউটিতে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি।
আমরা উঠে পড়লাম। আসিফ থেকে যা শুনলাম তা ডাইজেস্ট করতে আমাদের কিছু সময় লাগবে।
₼₼₼
ইলোরা লাইব্রেরীর দরজায় দাঁড়িয়ে একবার পিছনে ফিরে তাকাল। আসিফ এখন বইয়ে ডুবে গেছে, ওর দিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, শোনো, আসিফকে তোমার আজকে একবারও বিষণ্ন মনে হয়েছে?
আমি একটু ভেবে বললাম, উহুঁ
আমারও মনে হয়নি। উল্টো বেশ কয়েকবার হালকা রসিকতা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাই হওয়া উচিত?
-মানে?
-মানে যে মেয়েটার জন্য ও দিনের পর দিন হাসপাতালে পড়ে রইলো, সেই মেয়েটা আর নেই, হোক সেটা হ্যালুসিনেশন, তার জন্য ও মনো:কষ্টে থাকবে না?
-কী বলতে চাইছো?
আসিফ জয়নাল সাহেবের মৃত্যুর সময়টাতে তার পাশে থাকতে চেয়েছিল, যাতে তার মৃত্যুর পর খুকির অস্তিত্ব হারিয়ে না যায়। খুকির অবস্থার ওদের দুজনের মনে, কিন্তু জয়নাল সাহেবের মনে বেশির ভাগটুকু। আসিফ গত একদুই মাসে সেই অংশ ওর দিকে নিয়ে গেছে, যাতে জয়নাল সাহেব মারা গেলেও খুকি টিকে থাকে।
আমি ইলোরার কথায় এক অচেনা আশংকা আর ভীষণ অস্বস্তি অনুভব করি।
ইলোরা নীচু স্বরে বলল, খুকি আসিফের সাথে ফিরে এসেছে।
আমি ওর চোখ অনুসরণ করে লাইব্রেরীর শেষ মাথায় তাকাই। আসিফ পড়ার ফাঁকে হঠাৎ পাশে তাকিয়ে কথা বলছে, স্পষ্ট মনে হল কেউ আছে ওর সাথেই।
আমার গা শিরশির করতে থাকে।
